সাম্প্রতিক প্রকাশনা

ঢাকা মহানগরীতে এখন সারমেয়দের আগ্রাসন চলছে, এর থেকে বাঁচার উপায় বিজ্ঞানভিত্তিক নগর ব্যবস্থাপনা

আলতামাস পাশা লেখাটি পড়েছেন 47 জন পাঠক।
 ঢাকা মহানগরীতে এখন সারমেয়দের আগ্রাসন চলছে, এর থেকে বাঁচার উপায় বিজ্ঞানভিত্তিক নগর ব্যবস্থাপনা

ঢাকা শহরে রাস্তার কুকুর নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়, তবে সংকটটি ক্রমশ গভীর হচ্ছে। একদিকে কুকুরের কামড় ও জলাতঙ্কের ঊর্ধ্বমুখী পরিসংখ্যান, অন্যদিকে প্রাণিকল্যাণ সংগঠনগুলোর মানবিক আবেদননিবেদনে — এই দুই মেরুর মাঝখানে আটকে আছে রাষ্ট্রের নীতি। বিষয়টি নিছক আবেগের নয়; এটি অনেকদিনের একটি জনস্বাস্থ্য সংকট, একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং একটি নৈতিক প্রশ্নও বটে।

জনসংখ্যা ও কামড়ের পরিসংখ্যান

প্রাণি অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী ঢাকার দুই সিটিতে মোট প্রায় ৩৭ হাজার কুকুর রয়েছে।  তবে বিভিন্ন গবেষণা বলছে সংখ্যাটি আরও বেশি হতে পারে। ২০১২-১৩ সালে পরিচালিত একটি গবেষণায় ঢাকা শহরে ১৮,৫৮৫টি মুক্তবিচরণকারী কুকুরের অস্তিত্ব নির্ণয় করা হয়েছিল, প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৫২টি কুকুর।  তবে ২০১৬ সালের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায় মানুষ-কুকুর অনুপাত ছিল ১৯৩:১, যা মাত্র তিন বছরে প্রায় চারগুণ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।  

কামড়ের ঘটনা ও মৃত্যু ক্রমাগত বাড়ছে

ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ৯৪,৩৮০ জন, ২০২৪ সালে ১,২২,২৬৩ জন এবং ২০২৫ সালে ১,৪৬,২৪৩ জন কুকুর ও বিড়ালের আক্রমণের শিকার হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ইতিমধ্যে ৩৬,৭৫১ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।  

মৃত্যুর সংখ্যাও উদ্বেগজনক: ২০২৩ সালে ৪২ জন, ২০২৪ সালে ৫৮ জন এবং ২০২৫ সালে ৫৯ জন জলাতঙ্কে মারা গেছেন। ২০২৬ সালের প্রথম আড়াই মাসেই ১৯ জনের মৃত্যুর রেকর্ড হয়েছে। সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশে বার্ষিক ২ লক্ষেরও বেশি কুকুরকামড়ের ঘটনা নথিভুক্ত হয়।  

ঐতিহাসিক পটভূমি: নিধনের ব্যর্থ চক্র

ঢাকায় কুকুর নিধনের ইতিহাস দীর্ঘ এবং বারবার ব্যর্থ। ২০০৩ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট ও টঙ্গিতে মোট ১,৩৯,৩৯১টি কুকুর নিধন করা হয়েছিল, যার ৮০ শতাংশ অর্থাৎ ১,১২,০৭৮টি কুকুর শুধু ঢাকায়ই নিহত হয়েছিল (গড়ে বার্ষিক ২২,৪১৫টি) — তবুও জলাতঙ্কের প্রাদুর্ভাব থামানো সম্ভব হয়নি।  

এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে ২০১১-১২ সালে নীতি পরিবর্তনের সূচনা হয়। অমানবিক কুকুর হত্যার বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে অর্থায়ন করে জেলাভিত্তিক পৌরসভা পর্যায়ে গণটিকাদান কার্যক্রম চালু করে।  (Global Alliance for Rabies Control)

 
পরিবেশ দূষণ কীভাবে সমস্যা বাড়াচ্ছে?

ঢাকার পরিবেশ দূষণ শুধু মানুষের জন্য নয়, রাস্তার প্রাণীদের জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর। রাস্তার কুকুরগুলো প্রতিদিন পলিথিন, পচা খাবার, রাসায়নিক বর্জ্য ও দূষিত পানি গ্রহণ করছে। এতে তারা বিভিন্ন সংক্রামক রোগ বহনকারী প্রাণীতে পরিণত হচ্ছে।

একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, শুধু টিকাদান বা নির্বীজন যথেষ্ট নয়; শহরের বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ না করলে কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না। গবেষণাটি বলছে, “waste management coupled with vaccination” অর্থাৎ কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও টিকাদান একসঙ্গে চালাতে হবে। 

ঢাকার খোলা ড্রেন, অপরিষ্কার সড়ক ও আবর্জনার স্তূপে কুকুরেরা বসবাস করায় তাদের শরীরে ব্যাকটেরিয়া, পরজীবী ও ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। এসব জীবাণু পরে মানুষের মধ্যেও সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

শিশুদের জন্য কেন বেশি বিপজ্জনক?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, জলাতঙ্কে আক্রান্তদের বড় অংশই শিশু। বাংলাদেশেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ঢাকার সংক্রামক রোগ হাসপাতালের গবেষণায় দেখা গেছে, জলাতঙ্কে আক্রান্তদের প্রায় ৫৯.৫ শতাংশের বয়স ১৫ বছরের নিচে।

শিশুরা সাধারণত রাস্তায় খেলাধুলা করে, কুকুরকে উত্যক্ত করে বা অজান্তেই তাদের কাছে চলে যায়। ফলে তারা বেশি আক্রান্ত হয়। শিশুদের উচ্চতা কম হওয়ায় কামড় সাধারণত মুখ, গলা বা মাথার কাছাকাছি লাগে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

নাগরিকদের অভিজ্ঞতা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় অনলাইন আলোচনায় অনেক নাগরিক অভিযোগ করেছেন যে কিছু এলাকায় কুকুরের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে এবং শিশু ও বয়স্করা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। কেউ কেউ আবার বলছেন, কুকুরদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণও সমস্যা বাড়ায়, কারণ নির্যাতিত প্রাণী আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে।

CNVR কর্মসূচি: একটি আশার আলো এবং তার অবসান

২০১২ সালে ঢাকায় চালু হয় Catch-Neuter-Vaccinate-Return (CNVR) কর্মসূচি। দুই বছরে (২০১২-১৩) ঢাকার ৯২টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৯টিতে ৬,৬৬৫টি কুকুর (৩,৩৫৭টি পুরুষ ও ৩,৩০৮টি স্ত্রী) বন্ধ্যাত্বকরণ ও টিকাদান করা হয়। একটি পাইলট জরিপে গড় ৬০.৬% CNVR কভারেজ পাওয়া যায়, তবে মাত্র আটটি ওয়ার্ড ৭০%-এর উপরে থাকতে সক্ষম হয়েছিল।  

কিন্তু উত্তর সিটিতে এই কর্মসূচি অব্যাহত থাকলেও দক্ষিণ সিটিতে তা বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বন্ধ্যাত্বকরণ কর্মসূচি চলছিল, কিন্তু প্রধান ভেটেনারি কর্মকর্তা মৃত্যুর পর এই কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যায়।  একজন কর্মকর্তার অনুপস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি থেমে যাওয়া বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার বড় উদাহরণ বলা যেতে পারে।
২০২০ সালের বিতর্ক: সংকটের পুনরাবৃত্তি

২০২০ সালে বিষয়টি আবার তীব্র আকার নেয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা ঘোষণা দেন যে, ঢাকা শহর থেকে ৩০ হাজার কুকুর সরানো হবে। এই ঘোষণায় দুই পক্ষ মুখোমুখি হয়।

একপক্ষ কুকুর নিধনের দাবিতে মানববন্ধন করে, অন্যপক্ষ এর বিরুদ্ধে। বন্ধ্যাত্বকরণ বিশেষজ্ঞরা যুক্তি দেন, কুকুর নিধনে অর্থ ব্যয়ের চেয়ে বন্ধ্যাত্বকরণে অর্থ খরচ করা অনেক বেশি ফলপ্রসূ। ২০১০ ও ২০১২ সালের আগেও বহুবার কুকুর নিধন করা হয়েছে, কিন্তু কোনো স্থায়ী ফল আসেনি।  

পরিবেশ ও আচরণগত দিক থেকেও কুকুর স্থানান্তরের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি আছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা মত দেন যে, কুকুর কমিউনিটিভিত্তিক প্রাণী। তারা সাধারণত নিজের এলাকার কাউকে কামড়ায় না। এদের অন্য কমিউনিটিতে নিয়ে গেলে সেখানকার কুকুরগুলো এদের গ্রহণ করবে না, ফলে কুকুরে কুকুরে মারামারি হবে এবং কুকুর মানুষকেও কামড়াবে। অর্থাৎ কুকুর সরানো আসলে সমস্যা স্থানান্তর করে, সমাধান করে না।

প্রাণিপ্রেমীরা আরও উল্লেখ করেন যে টিকা দেওয়া কুকুর সরিয়ে নিলে নতুন অটিকাপ্রাপ্ত কুকুর আসবে, যা ঢাকাকে জলাতঙ্কের মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলবে। আইনি কাঠামো ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নির্দেশনার বিরুদ্ধে ২০১২ সালে উচ্চ আদালত কুকুর নিধনের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।  ফলে এই বিচারিক হস্তক্ষেপই CNVR কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনার ভিত্তি তৈরি করে। 

সম্প্রতি ২০২৫ সালের অক্টোবরে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বিভিন্ন জেলায় কুকুর নিধন কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশনা জারি করেছে। তবে সরকারি নির্দেশনা ও মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে যে বিস্তর ফাঁক রয়েছে, তা এই সংকটের মূল চালিকাশক্তি।

আন্তর্জাতিক তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি
প্রতিবেশী ভারতে ২০২৫ সালের নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট রাস্তা ও জনবহুল এলাকা থেকে সব বেওয়ারিশ কুকুর সরানোর নির্দেশ দেয়। হাসপাতাল, স্কুল, কলেজ, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন ও ক্রীড়া কমপ্লেক্স এলাকায় কুকুর নিষিদ্ধ করার এই নির্দেশ সংশোধনের পিটিশন ২০২৬ সালের মে মাসে খারিজ হয়ে যায়।  তবে ভারতের এই পদক্ষেপ বিতর্কিত হলেও দেখা যায় যে, দক্ষিণ এশিয়াজুড়েই সমস্যাটি অমীমাংসিত রয়েছে।

বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা বলছে TNVR/CNVR-ই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রমাণ সুস্পষ্ট: যখন কোনো এলাকার ৭০% বা তার বেশি কুকুরকে টিকা দেওয়া হয় এবং স্ত্রী কুকুরদের বন্ধ্যাত্বকরণ করা হয়, তখন সারমেয়দের জনসংখ্যা স্থিতিশীল হয় এবং মানুষের জলাতঙ্কের ঘটনা দ্রুত হ্রাস পায়।  

কার্যকর সমাধানের রূপরেখা

বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা কয়েকটি সমন্বিত পদক্ষেপের পরামর্শ দিচ্ছেন

১. TNVR জাতীয় মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ: ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উচিত প্রতিটি ওয়ার্ডে ধারাবাহিকভাবে স্থায়ী ও ভ্রাম্যমাণ টিম দিয়ে ট্র্যাপ-নিউটার-ভ্যাক্সিনেট-রিটার্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা এবং তা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাথে সমন্বয় করা।  

২. তথ্যের ঘাটতি দূর করা: তথ্যের ঘাটতি — যার মধ্যে আছে পরিগণনার অভাব, একীভূত টিকার রেকর্ড এবং কামড়ের ড্যাশবোর্ড — এই চক্রকে টিকিয়ে রাখছে। মানবিক ব্যবস্থাপনা আবেগের বিষয় নয়, এটি কার্যক্রম পরিকল্পনার বিষয়।  

৩. বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন: সিলড বিন এবং নির্দিষ্ট সময়ে বর্জ্য সংগ্রহ নিশ্চিত করলে কুকুরের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধিকে উস্কে দেওয়া সহজলভ্য খাদ্য উৎস নির্মূল করা সম্ভব।  

৪. জনসচেতনতা ও কমিউনিটি সম্পৃক্ততা: স্কুল, মসজিদ ও ক্লিনিকে কামড় প্রতিরোধ ও নিরাপদ খাওয়ানোর বিষয়ে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা।

৫. ব্যক্তি উদ্যোগে রাস্তার কুকুর খাওয়ানোর যে মানবিক কার্যাক্রম তা কুকুর সমস্যার স্থায়ী কোন সমাধান নয়। ঢাকা শহরে মানুষ এবং কুকুরের স্বার্থেই এদের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধিকে কমিয়ে আনতে হবে। কুকুর খাবার পাচ্ছে না বলে কামড়াতে আশে এ কথা কোন ভাবেই বিজ্ঞানসম্মত নয়। 

ঢাকার কুকুর সংকটে তিনটি স্তরের ব্যর্থতা স্পষ্ট

প্রশাসনিক ব্যর্থতা: দক্ষিণ সিটিতে একজন কর্মকর্তার মৃত্যুতে পুরো কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রমাণ করে এটি কখনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। CNVR কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ, জনবল ও পরিকল্পনার অভাব ছিল মৌলিক।

নীতি ও বাস্তবায়নের ফারাক: আদালতের নিষেধাজ্ঞা আছে, নির্দেশনা আছে — কিন্তু মাঠ পর্যায়ে তা কার্যকর করার রাজনৈতিক ইচ্ছা ও প্রশাসনিক ক্ষমতা নেই।

জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়: কামড়ের ঘটনা ও জলাতঙ্কে মৃত্যু প্রতি বছর বাড়ছে — এটি নিছক প্রাণিকল্যাণের প্রশ্ন নয়, এটি একটি নিরাময়যোগ্য জনস্বাস্থ্য সংকট যা কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণে ঘটছে।
সমাধান নিষ্ঠুরতায় নয়। দশকের বেশি সময়ের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে যে গণহত্যা কুকুরের সংখ্যা কমায় না — কমায় শুধু মানবিক মান। বিজ্ঞানসম্মত TNVR কর্মসূচি, কঠোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই টিকাদান কর্মসূচির সমন্বয়ই একমাত্র পথ — যা মানুষকেও যেমন রক্ষা করবে,  তেমনি করবে কুকুরকেও। আজ তাই প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক নগর ব্যবস্থাপনা ।

পাঠকের মন্তব্য


একই ধরনের লেখা, আপনার পছন্দ হতে পারে

bdjogajog