দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
রহস্য ঘনিয়ে এলো
ছোট্ট ছেলে পিপের কাঁপুনির দিকে লোকটার এতোটুকু নজর নেই। তার বীভৎস কদাকার মুখটা তখন পিপের চোখের সামনে।
কী বিশাল তার চোখ দুটি। পিপ চেয়ে নিশ্চল হয়ে পড়লো। ভয়ে তার বুকের ভিতরটা ঢিপঢিপ করতে লাগলো।
লোকটা গম্ভীর গলা বললো,
‘তুই এখুনি ছুটে পালা। কিন্তু ভোর না হতেই নিয়ে আসবি করাত আর হাতুড়ি। দুটোই আমার চাই। নইলে তোর কলজে খাবো। তোর রক্ত খাবো-’
পিপের প্রাণ তখন প্রায় কণ্ঠাগত।
এতো শীতের মধ্যেও তার শরীর ভওে দরদও করে ছড়িয়ে পড়ছে ঘাম। এক গা ঘেমে উঠেছে সে!
দানবটার মনে নেই এতোটুকু করুণা।
কী ভয়ংকর তার চাউনি।
তার কঠিন কণ্ঠস্বও ডুকরে উঠলো আবার,
বিপদে পড়েছিস বলে কাউকে ডাকতে পারবি নে তুই। মনে রাখিস, কাউকে কইতে পারবি না আমার কথা। কিছু না- এতোটুকুও না। যদি জানতে পারি বলেছিস, তা’হলে এক লহমায় মেরে ফেলবো তোকে।
সে আরও বলে চলে-
‘আমি একলা নেই এখানে! দেখছিস বটে একলা। কিন্তু আমার সঙ্গে একটা জোয়ান রাক্ষস আছে। বড়ো শখ তার বাচ্চা রক্তের! সেই তখন থেকে তাকে আসি ঠেকিয়ে রাখছি। ঠিকঠাক কথা রাখলে বেঁচে যাবি তুই, নইলে মরণ-মরণ- মরণ হবে তোর।’
রা রা শব্দে চেঁচিয়ে উঠলো লোকটা,
‘বল, বলে যা কি আনতে যাচ্ছিস তুই!
প্রায় মৃতপ্রায় পিপ বললো.
করাত, হাতুড়ি আর –আর খা- খাবার আনবো-
দৌঁড়ে যা, দৌঁড়ে যা, শীগগির!
পিপ ছুটে চললো।
পিছু ফিরে তাকাবে একবারও - সে সাধ্য হলো না তার।
রাত তখনো রয়েছে মেলাই। খাবার ঘরের দিকে ভোর রাতে কেউ নেই। পিপ ছুট গিয়ে ঢুকলো সেই ঘরের মধ্যে। একটা আস্ত রুটি তুলে নিল সে। একটা বাটি থেকে বেশ খানিকটা চিজ, এক বোতল ব্র্যান্ডিও সঙ্গে নিল।
সামনের ঘরে কামারশালা। খুঁজেপেতে মিথ্যেই অস্থির হলো সে।
নেই! হাতুড়িটা কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে কপালটা তা ভালো করাতটা মিলে গেলো। আর সেই সঙ্গে ছোটমত হাতুড়িও মিললো একটা। কোনদিকে ভ্রƒক্ষেপমাত্র না করে সে দুটো জিনিষ নিয়ে একরকম ছুটেই চললো আবার গোরস্তানের দিকে।
এবার তার ভয় বোনকে। দানবটা যা যা চেয়েছে তা সে এখুনি পেয়ে যাবে।
জিনিসগুলো পেয়ে গেলে সেও আর তাকে মারবে না। তাই সেদিক থেকে নিশ্চিত হতে পারলেও বোনের ভয়ে পিপ নতুন করে আবার শংকিত হয়ে উঠলো।
ছুটতে ছুটতে এতো সব ভেবে নিলো সে। বাইওে তখন যতোটা আঁধার, তার চেয়েও ঘন ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ছে কুয়াশা। ধোঁয়ার মতো সব, উড়ন্ত ধুলোর মতো সব সুমুখের পথ ঘাট আচ্ছন্ন করে ছড়িয়ে-গড়িয়ে লুটিয়ে আছে। তার মধ্যে দিয়ে দৌড়ে চললো পিপ! (চলবে)।
সামনে গোরস্থানের পথ শেষ হয়ে গেলো। পিপ গিয়ে পড়লো বড় গাছটার গুঁড়ির কাছাকাছি। এ পাশ থেকে সে দেখলো, লোকটা ঝিমুচ্ছে। কে জানে লোকটার শীতই লাগছে বোধ হয়।
মনে মনে ভাবলো সে, এই বোধ হয় এই জোয়ানমদ্দ রাক্ষসটা! বাব্বা, ওর কাছে গিয়ে কাজ নেই আমার। দেখতে পেলে খেয়ে ফেলতে কতোক্ষণ? তবু সে একপা একপা কওে এগিয়ে গেলো তার কাছে। কি জানি, খাবার পেয়ে লোকটা যদি খুশি হয়?
কিন্তু বৃথা ভাবনা। তাকে জোরেশোরে ধাক্কা দিয়ে ফেলেই সে এক ছুটে পালিয়ে গেল অন্ধকারে- সমুখের কুয়াশার রাজ্যে। পরক্ষণে সে হারিয়ে গেল। হতভম্ব পিপ উঠে পড়ে খুঁজতে লাগলো প্রথমোক্ত সেই দানব লোকটাকে।
কিন্তু বেশিক্ষণ তাকে খুঁজতে হলো না। লোকটা নিজেই তার সামনে এসে দাঁড়ালো।
বোতলটা কি এনেছিস, র্যা? পিপ বললো, - ব্র্যান্ডি।
লোকটা তখুনি বোতল হাতে বসে পড়লো পাশেই একটা ঝোঁপের মধ্যে। সেও তখন ঠকঠক করে কাঁপছে।
পিপ কিছুক্ষণ চেয়ে দেখলো তাকে। তারপর বললো, জ জ¦র হয়েছে আপনার, তাই না?
ডান হাতে বোতলটা বাঁ হাতে আস্ত রুটি, লোকটা কোক্রমে বললো, হবে হয় তো, কে জানে?
পিপ দেখলো লোকটার দানবীয় মেজাজ এখন অনেকটাই নরম।
কথা বলতেও তার ভালো লাগলো। চারপাশ কেমন নিঃসার, চুপচাপ। একঠায় দাঁড়িয়ে থাকা যায় নাকি?
সে আরো বললো, এসব ঝোঁপঝার জঙ্গল আর ভালো লাগে না। ওখানে কেউ পড়ে পড়ে ঘুমায় না। আপা বলেন, জ্বর হয়ে যায়। ওসব লতাপাতা গাছগাছড়া বেজায় খারাপ!
মুখ গুমরো দানবটা এবার দাবড়ে উঠলো পিপকে,
চুপ কর, বাচ্চা“ আগে খেতে দে, তারপর শুনবো তোর বাঁচা মরার কথা।
দুহাতের মুঠোতে রুটি, মুখে দাঁতে চেপে ধরে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো সে পিপকে। সে চোখ ধূর্ত, কুটিল। অবিশ্বাসের দৃষ্টি দেখলো পিপ তার চোখে। সংকুচিত হয়ে এলো পিপ।
রুটিটার কিছুটা চিবিয়ে খেয়ে ফেললো সে। তারপর চিবিয়ে চিবিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ঠকাচ্ছিস না তো রে ছোকরা? কাউকে সঙ্গে এনেছিস, র্যা?
তীব্রভাবে মাথা নাড়তে নাড়তে বললো পিপ, না না কাউকেই নয়। আমি একলা এসেছি। একদম একলা।
দানবের চাহনি আস্তে আস্তে শান্ত হলো, ধীরস্থির হলো। বোতলের ব্র্যান্ডিটুকু টেনে টেনে গিলতে লাগলো সে! তারপর বললো, তুই ব্ড্ড ভালো ছেলে রে। বড্ডো ভালো ছেলে।
পিপ তার কথা শুনে খুশি হলো। বললো, ওর জন্যে কিছু রাখলে না? ও তো খাবে?
পিপের কথা শুনে লোকটা বিদ্যুত বেগে লাফিয়ে উঠলো, কার কথা বলছিস? কে সে?
পিপ দূরে সরে গেলো। কাঁপা গলায় বললো, সেই যে জোয়ান রা-রাক্ষসটা! যার কথা তখন বললেন আমাকে লুকিয়ে আছে। যে,
ওঃ! এতোক্ষণে লোকটার মনে হলো, পিপকে সেই যে মিথ্যে ভয় দেখিয়ে রেখেছে একটা কল্পিত রাক্ষসের নাম করে, ছেলেটা তাকেই জিইয়ে রেখেছে মগজে।
হাঃ, হাঃ, হাঃ
লোকটা রুটিটে কামড় বসিয়ে বললো, না না তাকে কিচ্ছু দিতে হবে না।
পিপও নাছোড়বান্দা, বললো, আপনি বললেন না তখন তাকে ঠেকিয়ে রেখেছেন? কিন্তু ও তো দৌড়ে বেড়াচ্ছে এখানেই, আমি দেখলাম,
হাতের রুটি আর বোতল ছুড়ে ফেলে দিয়ে লোকটা পরক্ষণে দানবীয় শক্তিতে জড়িয়ে ধরলো পিপকে,
তুই দেখলি? কাকে দেখলি? কোথায় দেখলি?
এইতো আসবার সময়। গাছের তলায় আধোজাগা আধো ঘুমিয়ে। আমি ভাবলাম, আপনি..
কথা ঘুরিয়ে নিয়ে পিপ আরো বললো, আপনার মতোই জামা-কাপড় হাতে পায়ে লোহার শেকল। আর কাল রাতে কামানের আওয়াজ শোনেন নি আপনি?
লোকটা তখুনি মনে মনে ভাবলো, হায় ভগবান! তাহলে এরই মধ্যে ওরা টের পেয়ে গেছে!
পিপকে বললো, দেখ ভেবে বলবি, ঠিক করে বলতো তার মুখে মানে মুখে..
কাটা দাগ দেখেছি। পিপ বললো। নিজের ডান চিবুকে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো লোকটা, কোথায়? এখানে?
ঢোঁক গিলে পিপ বললো, হ্যাঁ ঠিক ওখানেই। মস্তবড়ো কাটা দাগ।
দানবটার কন্ঠে ক্রুদ্ধ গর্জন সরবে জেগে উঠলো,
দেখিয়ে দে কোথায় দেখেছিস তুই সেই শয়তানটাকে! ওটাকে আমি কুকুরের মতো গলা টিপে নিকেশ করবে। পায়ের শেকলটায় করাত চালা হতভাগা, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিস কি?
দে হাতুড়িটা আমার হাতে দে। আর যা, দূর হয়ে যা তুই এখান থেকে।
ক্ষিপ্ত দানবটা সেখান থেকে এক রকম খেদিয়েই তাড়ালো পিপকে। (চলবে)