সায়েন্স ফিকশন কাহিনী জগতে নতুন এক সংযোজন ‘ভালকানের স্বপ্ন’ বাংলাদেশে সায়েন্স ফিকশন লেখার শুরু সত্তরের দশক থেকে। হাতে গোণা কয়েকজন লেখক আমাদের সায়েন্স ফিকশন জগৎকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন। জনপ্রিয় হয়ে উঠছে সায়েন্স ফিকশন তরুণ পাঠকসহ সর্বশ্রেণীর মানুষের মধ্যে। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে সায়েন্স ফিকশন গল্পগুচ্ছ ‘ভালকানের স্বপ্ন’। প্রকাশক উত্থানপর্ব, লেখক আলতামাস পাশা। লেখক দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ও অনলাইন পোর্টালে সায়েন্স ফিকশন লিখছেন। সাম্প্রতিক প্রকাশনায় স্থান পেয়েছে মোট ছয়টি গল্প। প্রতিটি গল্পেই রয়েছে নতুনত্বের ছাপ সুস্পষ্ট। নতুন ধরনের মানবিক আবেদন সম্পন্ন সায়েন্স ফিকশনের জন্ম দিয়েছেন লেখক। বইটির প্রথম দুটি গল্পে ভিনগ্রহের উন্নত সভ্যতার প্রাণীদের সঙ্গে পৃথিবীর মানুষের সম্ভাব্য যোগাযোগের সম্ভাবনা বিবৃত হয়েছে। মঙ্গলগ্রহে উন্নত সভ্যতার কথা স্থান পেয়েছে, ‘ পৃথিবীর মানুষ আসছে’ সায়েন্স ফিকশনটিতে। দ্বিতীয় গল্প, ‘অবশেষে প্লুটোর জয়’ সায়েন্স ফিকশনে একটি হাইমাল্টি সুপার কম্পিউটার কিভাবে বিলুপ্তপায় সভ্যতার অস্থিত্ব টিকিয়ে রাখতে সহায়ক হলো তা দেখানো হয়েছে। ‘ভালকানের স্বপ্ন’ গল্পে লেখক দেখিয়েছে আমাদের পৃথিবীর সভ্যতাকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তঃমহাজাগতিক সম্পর্কিত বিপদ থেকে নানাভাবে কাজ করছে ভালকানের বাসিন্দারা। বাংলাদেশে নতুন প্রজন্মের নের্তৃত্বহীনতায় এক যুদ্ধ শিশু মেয়েকে বেছে নিয়েছে তারা। কিন্তু তুষারাবৃত আলপাইন পাহাড়ে অভিযানে গিয়ে মেয়েটি খাদে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পায়। তার ব্রেনের ডান দিকে ভালকানের নিউরণ স্থাপন করা হয়েছে আর বাম অংশে পৃথিবীর নিউরণ স্থাপনের জন্য ভালকানে বাসিন্দা মার্সিয়াসের পৃথিবীর বন্ধু বিজ্ঞান সাংবাদিক সোহেল আদনানের ডাক পড়লো। বইটির কাহিনী গাঁথুনি চমৎকার। পাঠকরা এক নিঃশ্বাসে পড়ে শেষ করতে পারবেন। বিজ্ঞান সাংবাদিক সোহেল আদনানের যে চরিত্রটি লেখক সৃষ্টি করেছেন তা নিঃসন্দেহে নতুনত্বের দাবি রাখে। একই রকম চরিত্র লেখক সৃষ্টি করেছেন তার ওপর দু‘টি কল্পকাহিনী, ‘চকরিয়ার বনদেবী’ ও ‘বুরুন্ডা কাহিনীতে’। অ্যাডভেঞ্জার প্রিয় সেলিম চৌধুরী আশ্চর্য যেসব অতিপ্রাকৃতিক ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন তার জন্য ভিনগ্রহের প্রাণীরা দায়ী কি’না সে প্রশ্নে সেলিম চৌধুরী দ্বিধান্বিত। লেখক সোহেল আদনান ও সেলিম চৌধুর নামে যেদুটি কাল্পনিক চরিত্র তৈরি করেছেন তা লেখকের কাহিনী বিন্যাসকে বিশেষ বৈচিত্র্য দিয়েছে। ভবিষ্যতে তার লেখায় এদুটি চরিত্রের সহাবস্থান পাঠককের কাছে হয়তোবা আরও বিচিত্র কাহিনী উপস্থাপিত করবে। ‘সায়েন্স এবং ফিকশন’, এদুটি শব্দের মধ্যে আপাত দৃষ্টিতে একটি পারস্পরিক বিরোধিতা থাকতে পারে। সায়েন্সের আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে ‘জ্ঞান’ মানে সত্য অনুসন্ধান। অন্যদিকে ফিকশনের মাঝে লুকিয়ে আছে বাস্তব জগতে যা ঘটে না কল্পনায় তা-ই ভেবে নেওয়ার ব্যাপারটি। অবশ্য বিষয়টি এমন নয় যে ফিকশনের সাথে বাস্তবতা বা সত্যের কোন সম্পর্ক নেই। বাস্তবের সাথে কল্পনার মিশ্রণ ঘটলেই তো ফিকশন তৈরি হয়। আর এক্ষেত্রে লেখক আলতামাস পাশা আশ্চর্য নিপুণতায় সংযোজন করেছেন মানবিক বিষয়গুলোকে এবং সেই সাথে বিমূর্ত হয়ে উঠেছে দেশপ্রেম। সেই সাথে যুক্ত হয়েছে বৃক্ষরাজি, প্রকৃতি, মানুষ, প্রাণীকুল ও আন্তঃমহাজাগতিক সভ্যতার পারস্পরিক সম্পর্ক এবং নির্ভরশীলতা। গতানুগতিক সায়েন্স ফিকশন থেকে আলতামাস পাশার লেখা কিছুটা হলেও ভিন্নতা এনে দিয়েছে। লেখক যদি এইধারা অব্যাহত রাখতে পারেন তা’হলে বাংলাদেশের কল্পকাহিনী জগতে অবশ্যই তিনি স্বতন্ত্র স্থান লাভে সক্ষম হবেন। বাস্তবের সাথে অবাস্তবের চমৎকার সংমিশ্রণ তিনি ঘটিয়েছেন। ভারসাম্য তার সায়েন্স ফিকশন থেকে কখনও হারিয়ে যায়নি। তার লেখা পড়ে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে সায়েন্স ফিকশন লেখকরা কি ভবিষ্যৎ দেখতে পান? না’কি শুধুই কল্পনা আর বাস্তবের সম্মিলনে তারা পৌঁছে যান আশ্চর্য এক নতুন জগতে। হয়তোবা এ জগৎ সাধারণেরও দৃষ্টি সীমার বাইরে। কিন্তু অবশ্যই সে জগৎ আছে আর সে জগতে প্রবেশাধিকার শুধুমাত্র সায়েন্স ফিকশন লেখকদেরই। ভালকানের স্বপ্ন বইটির মূল রাখা হয়েছে - ২২০ টাকা মাত্র (১০ ডলার)।